গুগল-কিভাবে-আয়-করে

গুগল কি? গুগল কিভাবে আয় করে?

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিনের নাম গুগল (Google)। তাই অনেকের মাথায় একটা কথা ঘুরপাক খায় গুগল কিভাবে আয় করে। সবাই জানে গুগল আমাদের ফ্রি সেবা দিয়ে থাকে। কিন্তু এই ফ্রী সেবা দেওয়ার পেছনে রয়েছে গুগলের মোটা অংকের টাকা ইনকাম। গুগল প্রতিমাসে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলায় আয় করে থাকে। গুগলের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস কি জানেন? “গুগল এডসেন্স”।

আমরা যখন কোনো ওয়েবসাইটে ভিজিট করে বিভিন্ন ধরণের বিজ্ঞাপন দেখতে পাই সেগুলো মূলত গুগল দেখিয়ে থাকে। আর এই গুগল এডসেন্স থেকে প্রায় ৭০.৭% আয় করে থাকে গুগল। যেটা গুগলের আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ।

কয়েক বছর আগে ২০১৮ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী গুগলের আয়ের মোট পরিমাণ ছিলো প্রায় ১৩৮ বিলিয়ন ডলার। যেটা গুগল তার বিভিন্ন খাত থেকে আয় করে ছিল। গুগল একটি কোম্পানি যেটা ইন্টারনেট জগতের প্রায় ৯০ ভাগ অংশ নিয়ে নিয়েছে।

আপনি হয়তো ইউটিউবের নাম শোনেছেন কিন্তু আপনি কী জানেন ইউটিউব কারা নিয়ন্ত্রণ করে? হ্যাঁ! গুগল ইউটিউবকে ২০০৬ সালে কিনে নিয়েছে যেটা বর্তমান সময় গুগলের একটি জনপ্রিয় প্রোডাক্ট।

গুগল এমন কিছু প্রোডাক্ট তৈরি করছে যেগুলো ছাড়া আমাদের ইন্টারনেট প্রায় অচল হয়ে যায়। সম্প্রতি যখন হুয়াই মোবাইলের জন্য গুগল প্লে স্টোর বন্ধ করে দিয়েছিল তখন হুয়াই কোম্পানি অনেক নিচে পড়ে গিয়েছিল।

এছাড়া অনেকে হুয়াই মোবাইল চালানো অফ করে দিয়েছিল। তাহলে আপনি বোঝতেই পারছেন গুগল তার কাছে কতটা ক্ষমতা রেখেছে। তাহলে চলুন আমরা জেনে নেই গুগল কিভাবে আয় করে

আরো পড়ুন-

গুগল কি (What Is Google)?

সহজ ভাষায় গুগল একটি কোম্পানি যেটা গুগল সার্চ ইঞ্জিন নামেও পরিচিত। ১৯৯৮ সালে ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন গুগল তৈরি করেন। যার রয়েছে বিভিন্ন ধরণের সার্ভিস। গুগল সবাইকে বিনামূল্যে সেবা দিয়ে থাকে।

গুগল-কি

গুগলের সার্ভিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো গুগল সার্চ ইঞ্জিন (Google search engine)। এছাড়া গুগলের আরো প্রোডাক্ট রয়েছে যেমন- জিমেইল, ইউটিউব, গুগল প্লে স্টোর, গুগল ড্রাইভ, ব্লগার ডটকম ইত্যাদি। সারা পৃথিবীর ৯০% মানুষ গুগল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে থাকে। আর বাকিরা Yahoo, Bing, Yeandex, Duckduckgo-ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে।

কিভাবে গুগল কাজ করে (How Google Works)?

গুগল কীভাবে কাজ করে বলতে মানুষ গুগল সার্চ ইঞ্জিনকেই বুঝিয়ে থাকে। আর এই সার্চ ইঞ্জিন কাজ করে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে। সার্চ ইঞ্জিন মূলত ক্রাউলার বা বট-এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।

সাধারণত কোনো ওয়েবসাইটের কনটেন্টগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য সার্চ ইঞ্জিনের সহায়তা নিয়ে থাকে। তাই যে ওয়েবসাইটগুলো সার্চ ইঞ্জিনের সাথে সংযুক্ত করা হয় তখন সেই ওয়েবসাইটে কোনো তথ্য বা কনটেন্ট শেয়ার করা হলে সার্চ ইঞ্জিনের বট বা ক্রাউলার সাথে নিজের কাছে সংগ্রহ করে রাখে। ফলে কেউ কোনো তথ্য খোঁজার জন্য সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ করলে সাথে সাথে সার্চ ইঞ্জিনের সংগ্রহ করা তথ্যগুলো উপস্থান করে। এভাবেই মূলত গুগল বা গুগল সার্চ ইঞ্জিন কাজ করে।

গুগল কিভাবে আয় করে (How does Google earn)?

আপনাকে দেওয়া বিনাম্যূলে সার্ভিসগুলো থেকেই গুগল টাকা ইনকাম করে থাকে। এছাড়া গুগল বেশ জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন হওয়ার কারনে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের সাথে চুক্তি করে সার্চ ইঞ্জিনের মধ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে।

গুগল-এডসেন্স-থেকে-টাকা-আয়

কোনো কোম্পানির যখন নতুন কোনো পণ্য তৈরি করা হয় তখন সবার কাছে প্রচার করার জন্য গুগলে অনেকে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। গুগল তাদের ৩টি বিজ্ঞাপন সার্ভিসের মাধ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। যথা: AdWords, AdSense, AdMob।

1. AdWords

এই বিজ্ঞাপন সার্ভিসটি গুগল তার সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে থাকে। যারা বিজ্ঞাপনদাতা তাঁরা গুগলের সাথে চুক্তি করে সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপন দেয়। সার্চ ইঞ্জিনে অনেক সময় কোনো কিছু লিখে সার্চ করলে সার্চ রেজাল্টের বাম দিকে “Ad”-লেখা শো করে। আর সেই অ্যাডগুলো গুগল দেখিয়ে থাকে।

যখন কোনো মানুষ সার্চ রেজাল্টের বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে তখন সেখান থেকে গুগল টাকা ইনকাম করে থাকে। গুগলের এই সার্ভিসটির সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো কোনো বিজ্ঞাপনদাতা “AdWords”-এর মাধ্যমে বিজ্ঞান দিলে কোনো টাকা নেয় না। গুগল তখনই টাকা নেয় যখন কেউ বিজ্ঞাপনদাতাদের বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে। আর এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন দেওয়াকে বলা হয় “CPC”-অর্থাৎ [ Cost Per Click ]-প্রতি ক্লিকে টাকা।

google-adsense-থেকে-আয়

উদাহরণস্বরূপ: আপনি একটি ইনকাম রিলেটেড ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন। যেখানে বিভিন্ন ধরণের ইনকাম টিপস শেয়ার করে থাকেন। কিন্তু আপনার সাইটে ভালো ভিজিটর পাচ্ছেন না। এখন আপনি চাচ্ছেন কেউ যদি “make money online“-লিখে গুগলে সার্চ করে তাহলে আপনার সাইট যেন সবার আগে শো করে।

মূলত এর জন্যই আপনাকে গুগলের “AdWords”-এর সহায়তা নিতে হবে। আর এর মাধ্যমে গুগলে যদি কেউ “make money online”-লিখে সার্চ করে তাহলে সবার আগে আপনার সাইট দেখা যাবে। আর প্রতি ক্লিকের জন্য গুগল আপনার কাছ থেকে টাকা আদায় করে নিবে। আর মূলত এটাই হচ্ছে AdWords-এর কাজ।

2. AdSense

গুগলের এই সার্ভিসটির মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ইউটিউবের মধ্যে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে থাকে। যখন কোনো ওয়েবসাইটে ভিজিট করেন তখন অনেক সময় আপনার সামনে বিজ্ঞাপন চলে আসে। যেমন- এই আর্টিকেলটি পড়ার সময়ে এই সাইটেও বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন। আর এই বিজ্ঞাপনগুলো গুগল শো করে থাকে। সাধারণত বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের পণ্য প্রচার করার জন্য গুগলে বিজ্ঞাপন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই বিজ্ঞাপনগুলো গুগল পাবলিশারদের মাধ্যমে দেখিয়ে থাকে।

যারা ওয়েবসাইট বা ইউটিউবের মাধ্যমে আয় করে থাকে তাদেরকে পাবলিশার বলা হয়। এক্ষেত্রে গুগল বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে একা টাকা নেয় না। বরং পাবলিশারদের ৪৯ ভাগ দিয়ে থাকে আর বাকি ৫১ ভাগ গুগল নিয়ে নেয়। আর এভাবেই গুগল এডসেন্সের মাধ্যমে গুগল টাকা আয় করে থাকে।

3. AdMob

মোবাইলে অ্যাপস বা গেম ডাউনলোড করার জন্য আমরা গুগল প্লে স্টোরে যেয়ে থাকি। যখন কোনো অ্যাপস বা গেম ইন্সটল করে চালানোর সময় বিজ্ঞাপন দেখে থাকি সেগুলো মূলত গুগলের সার্ভিস “AdMob”-থেকে দেখা যায়। প্লে-স্টোরের অ্যাপস বা গেমস গুলোর মধ্যে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্যই “AdMob”-সার্ভিসটি চালু করা হয়েছে। আর মূলত এভাবেই “AdMob”-এর মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে গুগল আয় করে থাকে।

অন্যান্য উৎস হতে গুগল কিভাবে আয় করে?

how-does-google-earn

গুগলের রয়েছে নানা ধরণের জনপ্রিয় সেবাসমূহ। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গুগল ৭০.৭% আয় করে থাকে। অন্যদিকে ২৯.৩ শতাংশ আয় করে থাকে তাদের সেরা সার্ভিসগুলোর মাধ্যমে। যেমন গুগল প্লে-স্টোর তাদের একটি জনপ্রিয় প্রডাক্ট যেখানে মানুষ এপস ও গেমস তৈরি করে পাবলিশ করে থাকে। এছাড়া গুগলের আরো প্রডাক্ট রয়েছে যেমন- জি সুইট, গুগল ম্যাপ, গুগল ট্রান্সলেট ও গুগল ডিভাইস ইত্যাদি।

গুগল প্লে-স্টোর

অ্যান্ড্রোয়েড মোবাইলের জন্য গুগল প্লে-স্টোর তৈরি করা হয়েছে। গুগল প্লে-স্টোরে বিভিন্ন অ্যাপস ও গেমস পাবলিশ করার জন্য টাকা ব্যয় করতে হবে। প্লে-স্টোরে কেউ অ্যাপস বা গেমস পাবলিশ করার জন্য বিনামূল্যে একাউন্ট খুলতে পারে না। মূলত এই টাকা গুগলকে দিতে হয়।

এছাড়া প্লে-স্টোরের মধ্যে কোনো অ্যাপস সবার আগে শো করার জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়ার অপশন রয়েছে। যেমনটা “AdWords”-এর মাধ্যমে করা হতো। আর এই বিজ্ঞাপনের জন্য গুগল টাকা নিয়ে থাকে। তাছাড়া গুগল প্লে-স্টোরের মধ্যে কিছু অ্যাপস বা গেম দেখা যায় যেগুলো টাকা দিয়ে ক্রয় করতে বলা হয়। আর যারা টাকা দিয়ে ক্রয় করে সেখান থেকেও গুগল অর্থ উপার্জন করে থাকে। আর এভাবেই গুগল “Play Store”-থেকে টাকা আয় করে থাকে।

জি সুইট

গুগলের জি সুইটের মধ্যে রয়েছে নানা ধরণের জনপ্রিয় পণ্যগুলো যেমন- গুগল ডকস, ক্ল্যালেন্ডার, স্লাইড, জিমেইল, শিট ও গুগল ড্রাইভ। এই পণ্যগুলো গুগল বিনামূল্যে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু পণ্যগুলো দিয়ে অতিরিক্ত কোনো সেবা নিতে গেলে আপনার কাছ থেকে গুগল অর্থ চাইবে। যারা কাজের জন্য বা ব্যাক্তিগত কারনে অতিরিক্ত সেবা নিয়ে থাকে তাঁরা গুগলকে অর্থ প্রদান করে থাকে। আর এই পণ্যগুলো থেকে গুগল ভালো মানের টাকা আয় করে।

গুগল ট্রান্সলেট ও ম্যাপ

এই দুটি সার্ভিস থেকে গুগল ভিন্ন ভাবে টাকা আয় করে থাকে। আর তাঁরা ফ্রী সেবা দিলেও বিভিন্ন কোম্পানি তাদের কাছ থেকে API-ক্রয় করে থাকে। ফলে গুগল তাদের কাছ থেকে টাকা ইনকাম করতে পারে। অন্যদিকে গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করার জন্য গুগলকে কোনো টাকা দিতে হয় না। কিন্তু এর থেকে অতিরিক্ত সেবা নেওয়ার জন্য আপনাকে টাকা প্রদান করতে হবে।

গুগল ডিভাইস

বিভিন্ন ধরণের মোবাইল ডিভাইস নিয়ে রয়েছে গুগল বিশাল বাজার। প্রায় চার বছর আগে গুগল সর্বপ্রথম “Pixel”-নামক একটি মোবাইল ফোন আবিষ্কার করেন। যেটা বাজারে বেশ চাহিদাসম্পূর্ণ ছিলো।

এছাড়া গুগল আরো বিভিন্ন নামের মোবাইল ফোন আবিষ্কার করেন ক্রোমকাস্ট, ক্রোমব্যক ইত্যাদি। এই মোবাইল ফোনগুলো বর্তমান বাজারে বড় কোম্পানি ওয়ান প্লাস ও অ্যাপের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে টিকে আছে। প্রায় দুই বছর আগে ২০১৮ সালে গুগল তার মোবাইল ডিভাইসগুলো থেকে প্রায় ২.৯৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিলো।

উপসংহার

আজকে আপনি জানতে পারলেন গুগল কিভাবে আয় করে। এছাড়া আরো জানানু হয়েছে গুগল কি ও কিভাবে কাজ করে। আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে আপনার অনেক উপকারে আসবে। কারণ গুগল সম্পর্কে অনেকেই জানে না। আর এটা সারা বিশ্বের মধ্যে নামকরা একটি কোম্পানি যেটা সম্পর্কে সবার জানা উচিৎ। আর্টিকেলটি ভালো লাগলে সবার কাছে শেয়ার করবেন।

Leave a Comment